হেয়ার ফল কমাতে যে অভ্যাসগুলো যুক্ত করবেন হেয়ার কেয়ার রুটিনে

hair fall

‘চুলে চিরুনি দিয়ে আঁচড়াতেই এক গোছা চুল হাতের মুঠোয় চলে এলো! ঘরের ভেতর যেখানে সেখানে উড়ো চুলের ছড়াছড়ি! কীভাবে এত চুল উঠছে কিছুই বুঝতে পারছেন না! চুলের এই অবস্থা দেখতে দেখতে মনটাও বেশ খারাপ।’ এই দৃশ্যটা কমবেশি আমাদের সবার জন্যই খুব কমন। চুল পড়ার এই সমস্যায় যারা ভুগছেন, কেবল তারাই জানেন এই পরিস্থিতিতে মন ভালো রাখা কতটা কঠিন। তাই বলে কি এর কোনো সমাধান নেই? সমস্যা থাকলে, সমাধান থাকবেই। চুল পড়া সমস্যা কমানোর সমাধানও আছে। চলুন আজ জেনে নেই, হেয়ার ফল কমাতে হেয়ার কেয়ার রুটিনে কোন অভ্যাসগুলো যুক্ত করলে উপকার মিলবে।

চুল কেন পড়ে?

বিশেষজ্ঞরা বলেন, দিনে ৯০/১০০টা চুল পড়া স্বাভাবিক। যে চুলগুলো পড়ে যাচ্ছে সেই জায়গাগুলোতে আবারও চুল গজাবে। তবে এর বেশি যদি চুল পড়ে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। এই হেয়ার ফল হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেমন-

  • পুষ্টিকর খাবার না খাওয়া
  • দুশ্চিন্তা
  • অতিরিক্ত হিট স্টাইলিং
  • টাইট হেয়ারস্টাইল
  • কেমিক্যাল হেয়ার ট্রিটমেন্ট
  • পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া
  • ধূমপান করা
  • শারীরিক কসরত না করা
  • হরমোনাল ইমব্যালেন্স
  • প্রেগনেন্সি

হেয়ার ফল কমাতে চান?

হেয়ার ফল কমাতে যে অভ্যাসগুলো মেনে চলবেন

নানা কারণে চুল পড়া সমস্যা বাড়তে পারে। তাই আপনাকে বুঝতে হবে কোন সমস্যাগুলো আপনাকে ট্রিগার্ড করছে। সে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে নিন। এরপর সেগুলো দূর করতে চেষ্টা করুন। তবে হেয়ার ফল কমাতে চাইলে কয়েকটি অভ্যাস আপনার হেয়ার কেয়ার রুটিনে অ্যাড করতেই হবে। নইলে এই সমস্যা সহজে কমবে না।

১) স্ক্যাল্প ম্যাসাজ করা

হেয়ার থিকনেস প্রমোট করতে চাইলে নিয়মিত স্ক্যাল্প ম্যাসাজ করতে হবে। গবেষণা মতে, দিনে ১১ থেকে ২০ মিনিট স্ক্যাল্প ম্যাসাজ করাতে ৬৮.৯% ব্যক্তির হেয়ার ফল কমেছে এবং চুলের থিকনেস বেড়েছে। স্ক্যাল্প ম্যাসেজ হেয়ার গ্রোথ স্টিমুলেট করে। তাই চেষ্টা করুন দিনের যে কোনো একটা সময়ে স্ক্যাল্প ম্যাসাজ করতে।

২) শ্যাম্পু ও কন্ডিশনারের ব্যবহার

চুল যদি ড্যামেজ হয়ে যায়, তাহলেও হেয়ার ফল বাড়তে থাকে। এ জন্য চুল ও স্ক্যাল্পের ময়েশ্চার ধরে রাখা জরুরি। চুল নারিশড রাখতে তাই বেছে নিতে হবে সঠিক শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার। কিছু শ্যাম্পু আছে চুলের ময়েশ্চার স্ট্রিপ করে ফেলে অর্থাৎ ময়েশ্চার ধুয়ে যায়। এ ধরনের শ্যাম্পু ব্যবহারে বিরত থাকতে হবে। বেছে নিতে হবে জেন্টল শ্যাম্পু। শ্যাম্পুর পর অবশ্যই কন্ডিশনার অ্যাপ্লাই করতে হবে। এতে হেয়ার ব্রেকেজ কমবে এবং চুলের আগা ফাটা রোধ হবে। চুলে যেন জট না লাগে সেজন্য লিভ ইন কন্ডিশনার অ্যাপ্লাই করতে পারেন। এটিও ব্রেকেজ, স্প্লিট এন্ড ও ফ্রিজিভাব কমাবে এবং চুল রাখবে সফট।

৩) অয়েল ম্যাসাজ

হেয়ার ফল কমাতে হেয়ার অয়েল ম্যাসাজ

হেয়ার ফল কমাতে হেয়ার কেয়ার রুটিনে অ্যাড করতে হবে অয়েল। এক্ষেত্রে হট অয়েল ম্যাসাজ খুব ভালো কাজ করে। ম্যাসাজের কারণে ব্লাড সার্কুলেশন স্বাভাবিক হয়ে হেয়ার কিউটিকলের মাধ্যমে ভিটামিন ও প্রোটিন সরবরাহ করে। সেই সাথে চুলের গোড়া শক্ত হয় এবং চুল হয় সিল্কি। চুল পড়া কমে এবং হেয়ার গ্রোথ বাড়ে। চুলের যত্নে নারিকেল তেল, ক্যাস্টর অয়েল বেশ ভালো কাজ করে। সেই সাথে এর সাথে যোগ করতে পারেন কয়েক ফোঁটা আরগান অয়েল ও রোজমেরি অ্যাসেনশিয়াল অয়েল।

৪) কম হিটে ব্লো ড্রাই করা 

অফিসে বা ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার আগে চুল শুকানোর জন্য আমরা অনেকেই ব্লো ড্রাই করি। চুল শুকানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে ন্যাচারালি শুকানো। মাইক্রোফাইবার টাওয়েল দিয়ে চুল র‍্যাপ করে রেখে শুকিয়ে নিন। যদি সময়ের অভাবে সেটা সম্ভব না হয়, তাহলে কম হিটে ড্রায়ার ইউজ করুন। বেশি হিট হলে চুলের গোড়া নরম হয়ে যাবে এবং চুল দুর্বল হয়ে উঠে আসবে।

৫) হিট স্টাইলিং কম করা

হেয়ার ব্রেকেজের অন্যতম একটি কারণ কী বলুন তো? হেয়ার ড্রায়ার, স্ট্রেইটনার, কার্লিং আয়রন বেশি বেশি ব্যবহার করা। এগুলর ব্যবহার যত বেশি হবে, তত চুলের ক্ষতি হবে, চুল পড়া বাড়বে। তাই চেষ্টা করুন যতটুকু সম্ভব হিট ফ্রি স্টাইলিং মেথড ফলো করতে। যখন স্টাইল করবেন তখন অবশ্যই হিট প্রোটেকশন প্রোডাক্ট আগে ব্যবহার করে নিন।

৬) চুল টাইট করে না বাঁধা

অনেক ধরনের হেয়ারস্টাইলের মধ্যে কমন একটি স্টাইল হচ্ছে চুল বেশ টাইট করে বেঁধে বান, পনিটেইল, পিগটেইল বা ব্রেইড করা। এ ধরনের স্টাইলগুলো নিয়মিত করতে থাকলে হেয়ার লস হতে পারে, যাকে অ্যালোপেশিয়া বলে। সময়ের সাথে সাথে এটি পার্মানেন্ট হেয়ার লসেরও কারণ হতে পারে। তাই এ ধরনের স্টাইল করা থেকে বিরত থাকুন।

৭) নিয়মিত চুল আঁচড়ানো

চুল আঁচড়ানো

অনেকেই ভাবেন দিনে কোনো এক সময় জাস্ট একবার চুল আঁচড়ালেই হয়ে যায়। আবার ভাবেন, চুলে জট কীভাবে লাগছে? চুল ভালোভাবে না আঁচড়ালে জট লাগবেই।  আর জট লাগলেই চুল ছিঁড়বে, উঠে আসবে, বাড়বে হেয়ার লস। তাই হেয়ার ফল কমাতে চাইলে দিনে অন্তত ২ বার চুল আঁচড়ানো জরুরি। চুল আঁচড়ালে স্ক্যাল্পে রক্ত চলাচল বাড়ে, হেয়ার ফলিকলস উদ্দীপিত হয়, জট বাঁধার সম্ভাবনা কমে যায়। চুলের জন্য কাঠের চিরুনি বেশ ভালো। তাছাড়া ডিট্যাঙ্গলিং ব্রাশও ব্যবহার করতে পারেন।

৮) ঘরে হেয়ার কালারিং বা কেমিক্যাল ব্যবহার না করা

অনেকেই ভাবেন, পার্লারে যেয়ে হেয়ার কালারিং বা কেমিক্যাল স্ট্রেইটেনিং করে ফেলা যায়। বাইরেও যেতে হলো না, আবার খরচও বাঁচলো। কিন্তু আপনি কীভাবে বুঝবেন কোন কেমিক্যালটি আপনাকে স্যুট করবে বা করবে না? না বুঝে অ্যাপ্লাই করার কারণে চুলের মস্ত বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। সেই সাথে বাড়তে পারে হেয়ার ফল। তাই একজন হেয়ার প্রফেশনালের কাছে যেয়ে স্ক্যাল্প এক্সামিন করে নিন আগে। এরপর তিনিই সাজেস্ট করবেন কোন প্রোডাক্টগুলো আপনার জন্য ভালো। তাছাড়া বার বার হার্শ কেমিক্যাল ট্রিটমেন্টের কারণেও হেয়ার স্ট্র্যাকচার দুর্বল হয়ে যায়। এতেও চুল পড়া বেড়ে যায়। তাই চুলের জন্য যতটুকু সম্ভব ন্যাচারাল ইনগ্রেডিয়েন্ট ব্যবহার করুন।

৯) পর্যাপ্ত ঘুমানো

আমাদের সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন। ঘুম না হলে শরীরের ন্যাচারল প্রসেস বাঁধাগ্রস্ত হয়, এমনকি হেয়ার গ্রোথ পর্যন্ত। একজন পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তির অন্তত ৬/৭ ঘন্টা ঘুমানো উচিত। এতে ওভারঅল হেলথ তো ভালো থাকবেই, সেই সাথে হেয়ার হেলথও ভালো থাকবে।

১০) সঠিক ডায়েট

আপনি কি জানেন সঠিক ডায়েট না করার কারণেও হেয়ার ফল হয়? অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এক ধরনের এনভায়রনমেন্টাল ফ্যাক্টর, যার কারণে হেয়ার ফলিকল ড্যামেজ হয় এবং হেয়ার ফল বাড়তে থাকে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্টযুক্ত খাবার এ ধরনের স্ট্রেস এর লক্ষণ বুঝলে তার সাথে ফাইট করে। যার কারণে স্ট্রেস কম হয় এবং চুল পড়া কমে। এসব খাবারের মধ্যে আছে রঙিন ফলমূল ও সবজি যেমন- স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, পালং শাক, মাছ, মুরগীর মাংস, ডিম, ব্রকলি, বাদাম ইত্যাদি। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়ায় চিনিযুক্ত বিভিন্ন খাবার, প্রসেসড ফুড, প্রিজারভেটিভযুক্ত খাবার ইত্যাদি। তাই হেয়ার ফল কমাতে চাইলে এ ধরনের খাবারগুলো অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে।

১১) স্ট্রেস রিলিফ করা

হেয়ার ফল কমাতে মেডিটেশন

আমাদের হেয়ার হেলথ ভালো না থাকার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে স্ট্রেস বেশি থাকা। যতই চুলের নানাভাবে যত্ন নিন না কেন, দিনশেষে স্ট্রেস রিলিফ করতে না পারলে কোনো উপকারই হবে না। তাই স্ট্রেস রিলিফের জন্য যত ধরনের প্র্যাকটিস আছে যেমন- মেডিটেশন, ইয়োগা, ডিপ ব্রিদিং এক্সারসাইজগুলো করার চেষ্টা করতে হবে।

১২) ন্যাচারাল ইনগ্রেডিয়েন্ট দিয়ে হেয়ার মাস্ক তৈরি করা

হেয়ার ফল কমাতে ন্যাচারাল ইনগ্রেডিয়েন্ট দিয়ে ঘরেই বানিয়ে ফেলতে পারেন হেয়ার মাস্ক। যেমন- অ্যালোভেরা, ডিম, টক দই, মেহেদি, জবা ইত্যাদি। এই উপাদানগুলো হেয়ার ফল কমাতে খুবই কার্যকরি।

চুল পড়া বেড়ে গেলে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, শুধু চিন্তাই করছেন, কোনো সল্যুশন ভাবছেন না – এমন হলে একদমই হবে না। চুল কেন পড়ছে সেই কারণটি আইডেন্টিফাই করুন। এরপর সেই হিসেবে ট্রিটমেন্ট শুরু করুন। হেয়ার ফল কমাতে হেয়ার কেয়ার রুটিনে এই অভ্যাসগুলো অ্যাড করলে বেনিফিটগুলো নিজেই বুঝতে পারবেন। এসব কিছু করেও যদি আপনার চুল পড়া না কমে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রেগনেন্সির কারণে যাদের চুল পড়ছে, তারা অবশ্যই গাইনোকলজিস্টের পরামর্শ নিয়ে মেডিসিন গ্রহণ করবেন। চুলের যত্নে বিভিন্ন প্রোডাক্ট পেয়ে যাবেন চারদিকে’তে। চারিদিকে’র দুটি আউটলেট রয়েছে বসুন্ধরা সিটি শপিং মল ও নারায়ণগঞ্জ এর চাষাড়াতে আল জয়নাল ট্রেড সেন্টারে। ফিজিক্যালি কিনতে চাইলে এই দুটি আউটলেট ঘুরে আসতে পারেন। আর ঘরে বসে প্রোডাক্ট হাতে পেতে চাইলে অর্ডার করতে পারেন চারিদিকে’র ওয়েবসাইট ও অ্যাপে।

ছবি – সাটারস্টক

7 I like it
2 I don't like it